অন্যান্য

প্রশ্ন: তওবা-ইস্তেগাফার কি একই বিষয়? তওবা ও ইস্তেগফার শব্দদ্বয়ের অর্থ কি?তওবা-ইস্তেগফার কিভাবে করা উত্তম?

উত্তর: তওবা-ইস্তেগাফার শব্দদ্বয় আরবী।
তওবা শব্দের অর্থ হল: অনুশোচনা করা, প্রত্যাবর্তন করা, ফিরে আসা ইত্যাদি।
ইস্তেগফার শব্দের অর্থ হল: ক্ষমা প্রার্থনা করা।
শব্দ দুটির অর্থ খুবই কাছাকাছি।

 

🔴 তওবা ও ইস্তেগফারের মধ্যে পার্থক্য :
ব্যাপক অর্থে তওবা বলা হয়: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জীবনের অন্যায় বা পাপরাশি থেকে নিজেকে মুক্ত করা। অন্যায়ের প্রতি অনুশোচনা করত: দৃঢ়তার সাথে বর্জন করার অঙ্গিকার গ্রহণ করা। এবং ভবিষ্যতে অন্যায়ে ফিরে না যাওয়ার মনমানসিকতা পোষণ করা।

ইস্তেগফার বলা হয়; কখনো তওবার অর্থেও হতে পারে। আবার কখনো শুধুমাত্র ক্ষমা প্রার্থনার শব্দগুলো উচ্চারণ করাকেও ইস্তেগফার বলা হয়। যেমন; আস্তাগফিরুল্লাহ (হে আল্লাহ! আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি)। আল্লাহুম মাগফির লি (হে আল্লাহ তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।
তওবা-ইস্তেগফার বা আল্লাহর নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। যা নিতান্ত প্রয়োজনীয় বিষয়। শরীয়তে তওবা-ইস্তেগফারের গুরুত্বও অনেক।

 

🔴 তওবা-ইস্তেগফারের গুরুত্ব ও ফযীলতঃ

🔷 আল্লাহর আদেশঃ আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاسْتَغْفِرُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ (البقرة:199)

‘তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থী হও, নিশ্চয় মহান আল্লাহ্‌ ক্ষমাশীল, অতীব দয়ালু’ (সূরা বাকরাহ:১৯৯)

وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا اللَّهُ (آل عمران:135)

‘যারা কোন পাপ কাজ! করে ফেললে কিংবা নিজেদের প্রতি যুলম করলে আল্লাহকে! স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং আল্লাহ ব্যতীত গুনাহসমূহের ক্ষমাকারী কেই বা আছে’ (সূরা আলে ইমরান:১৩৫)

أَفَلَا يَتُوبُونَ إِلَى اللَّهِ وَيَسْتَغْفِرُونَهُ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ (المائدة:٧٤)

“তবে কি তারা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করবে না ও তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করবে না? আর আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

 

🔵 নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশ:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوبُوا إِلَى اللَّهِ فَإِنِّي أَتُوبُ فِي الْيَوْمِ إِلَيْهِ مِائَةَ مَرَّةٍ (مسلم)

“হে মানবমণ্ডলী! তোমরা আল্লাহর নিকট তাওবা কর, আর আমি দৈনন্দিন একশত বার তাঁর নিকট তাওবা করি” (সহীহ মুসলিম)।

 

💠 আল্লাহ তাআলা খুশী হন:

রাসূলু¬ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

لَلَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ الْمُؤْمِنِ) (مسلم)

“আল্লাহ তাঁর মু’মিন বান্দার তাওবার কারণে অধিকতর আনন্দিত হন” (সহীহ মুসলিম)।

রাসূলু¬ল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

لَلَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ أَحَدِكُمْ مِنْ أَحَدِكُمْ بِضَالَّتِهِ إِذَا وَجَدَهَ

“তোমাদের কেউ তার হারানো মাল পুনঃপ্রাপ্তিতে যতটা আনন্দিত হয়, তোমাদের কারো তাওবায় (ক্ষমা প্রার্থনায়) আল্লাহ তার চেয়ে অধিক আনন্দিত হয়।

 

🔵 আল্লাহ তাআলা তওবা- ইস্তেগফারকারীকে ভালবাসেন:

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ (سورة البقرة:222)

“মহান আল্লাহ তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালবাসেন।” (সূরা আল বাকারা: ২২২)

 

🔴 তওবা-ইস্তেগফার রিযিক বৃদ্ধির উত্তম মাধ্যমঃ

আল্লাহ তা‘আলা নূহ (আ.)-এর উক্তি উল্লেখ করে বলেন:

اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا. يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا. وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا (سورة النوح:10-12)

“তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর অজস্র ধারায় বৃষ্টির নহর ছেড়ে দিবেন। তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি বাড়িয়ে দেবেন তোমাদের জন্য উদ্যান স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্য নদীনালা প্রবাহিত করবেন।” (সূরা নূহ:১০-১২)

 

🔵 তওবা-ইস্তেগফার দুনিয়া-আখিরাতে সফলতা অর্জনের উত্তম মাধ্যমঃ

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ[النور:31)

‘হে মুমিনগণ! তোমরা সকলেই আল্লাহর কাছে তাওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার”””(সূরা নূর:৩১)।

فَأَمَّا مَنْ تَابَ وَآَمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَعَسَى أَنْ يَكُونَ مِنَ الْمُفْلِحِينَ (سورة القصص:67)

“যারা তওবা করে, ঈমান আনে ও আমলে সালিহ করে, আশা করা যায় তারা সফলকাম হবে।” (সূরা কাসাস:৬৭)।

 

🔴🔵 তওবা-ইস্তেগফারের পদ্ধতি:

তওবা-ইস্তেগফারের পদ্ধতি দুধরণের: (১) নিদির্ষ্ট (২) অনিদির্ষ্ট

নিদির্ষ্ট কোন অন্যায় ঘটে গেলে, সে অন্যায় থেকে তওবা বা সঠিক অবস্থায় ফিরে আসা। আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا عَسَى رَبُّكُمْ أَنْ يُكَفِّرَ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ)) (سورة التحريم:8)

ওহে, যারা ঈমান এনেছ! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবাহ কর- আন্তরিক তাওবাহ। সম্ভবতঃ তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কাজগুলোকে তোমাদের থেকে মুছে দিবেন, আর তোমাদেরকে দাখিল করবেন জান্নাতে; যার তলদেশ দিয়ে বয়ে চলেছে ঝর্ণাধারা (সূরা তাহরীম:৮)।

 

📌 উল্লেখ্য: তাওবা নাসূহ বা একনিষ্ঠ তওবার কয়েকটি শর্ত রয়েছে:

– চলমান অন্যায় বর্জন করা
– ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতি অনুশোচনা বা অনুতপ্ত হওয়া
– আগামী জীবনে অন্যায় না করার অঙ্গীকার করা
– মানুষের হক হলে তা হকদ্বারের নিকট ফিরিয়ে দেয়া।

একে তওবা নাসূহ বা বিশেষ তওবা বলে

এ মর্মে যথেষ্ট হাদীস বর্ণিত হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

مَا مِنْ رَجُلٍ يُذْنِبُ ذَنْبًا فَيَتَوَضَّأُ فَيُحْسِنُ الْوُضُوءَ ثُمَّ يُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ وَقَالَ مِسْعَرٌ ثُمَّ يُصَلِّي وَيَسْتَغْفِرُ اللَّهَ إِلَّا غَفَرَ اللَّهُ لَهُ

‘কোন ব্যক্তি গুনাহ করার পর উত্তমরূপে ওযু করে দু’ রাকআত সালাত পড়ে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। মিসআর (রাঃ)-এর বর্ণনায় শুধু সালাত উল্লেখ আছে (রাকআত সংখ্যা উল্লেখ নেই)” (ইবনে মাজাহ)
অথবা যে দুআ দিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে তওবা-ইস্তেগফার করতেন সে দুআর মাধ্যমে তওবা-ইস্তেগফার করা।

নিম্নে কয়েকটি দুআ উল্লেখ করা হল:

أَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ

উচ্চারণঃ আস্তাগফিরুল্লা-হা ওয়া আতূবু ইলাইহি।

অনুবাদঃ আমি আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করছি ও তাঁর দিকে ফিরে আসছি।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) প্রতিদিন ৭০ বারের অধিক তাওবা ও ইসতিগফার করতেন। [বুখারী-৬৩০৭]

رَبِّ اغْفِرْ لِيْ وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ أنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيْمُ الغَفُوْرُ

উচ্চারণঃ রাব্বিগ্ ফিরলী, ওয়া তুব ‘আলাইয়্যা, ইন্নাকা আনতাত তাওয়া-বুর রাহীম। দ্বিতীয় বর্ণনয় “রাহীম”-এর বদলে: ‘গাফূর’।

অনুবাদঃ হে আমার প্রভু, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি মহান তাওবা কবুলকারী করুণাময়। দ্বিতীয় বর্ণনায়: তাওবা কবুলকারী ও ক্ষমাকারী।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মসজিদে বসে এক বৈঠকেই এই দোয়া ১০০ বার পড়েছেন। [আবূ দাঊদ-১৫১৬, ইবনু মাজাহ-৩৮১৪, তিরমিযী-৩৪৩৪, মিশকাত-২৩৫২]

 

اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ

উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা আনতা রব্বী লা-ইলাহা ইল্লা আনতা খালাক্কতানী ওয়া আনা আ’বদুকা ওয়া আনা আলা আহ্দিকা ওয়া ও’য়াদিকা মাসতাত’তু আ’উযুবিকা মিন শার্রি মা ছা’নাতু আবূউলাকা বিনি’মাতিকা আলাইয়্যা ওয়া আবূউলাকা বিযানবী ফাগ্ফির্লী ফাইন্নাহু লা-ইয়াগফিরুয্যুনূবা ইল্লা আনতা

অনুবাদঃ হে আল্লাহ তুমিই আমার প্রতিপালক। তুমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তুমিই আমাকে সৃষ্টি করেছ। আমি তোমারই গোলাম। আমি যথাসাধ্য তোমার সঙ্গে প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকারের উপর আছি। আমি আমার সব কৃতকর্মের কুফল থেকে তোমার কাছে পানাহ চাচ্ছি। তুমি আমার প্রতি তোমার যে নিয়ামত দিয়েছ তা স্বীকার করছি। আর আমার কৃত গুনাহের কথাও স্বীকার করছি। তুমি আমাকে মাফ করে দাও। কারন তুমি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারবে না।))
এই দোয়া সকালে পড়ে রাতের আগে মারা গেলে অথবা রাতে পড়ে সকালের আগে মারা গেলে সে জান্নাতে যাবে। [বুখারী-৬৩০৬]

 

অনিদির্ষ্ট তওবা হলঃ তওবা বা ক্ষমা প্রার্থনার শব্দগুলো অধিকহারে পাঠ করা, সংখ্যা বা পদ্ধতি নির্ধারণ না করা; যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঠ করতেন।

أَستَغْفِرُ اللهَ

উচ্চারণঃ আস্তাগফিরুল্লাহ।

অনুবাদঃ আমি আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

 

أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الَّذِي لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْحَىُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ

উচ্চারণঃ আস্‌তাগফিরুল্লা-হাল্লাযী লা- ইলা-হা ইল্লা- হুওয়াল হাইয়্যুল কইয়্যূম ওয়া আতূবু ইলায়হি।

অনুবাদঃ আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, তিনি ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন মা‘বূদ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী এবং তাঁর কাছে তাওবাহ করি।
এই দোয়া পড়লে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন-যদিও সে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নকারী হয়। [আবু দাউদ-১৫১৭, তিরমিযী-৩৫৭৭, মিশকাত-২৩৫৩]

 

📌 এ ছাড়াও যে দুআগুলি নির্দিষ্ট সংখ্যায়, নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বর্ণিত হয়েছে সেগুলোকে অনির্দিষ্ট ভাবে অধিকহারে পাঠ করা।

-আল্লাহু আ’লাম

 

——————————–
উত্তর প্রদান:
শাইখ কা‌সেম বিন আব্বাস মাদানী

➥ লিংকটি কপি অথবা প্রিন্ট করে শেয়ার করুন:
পুরোটা দেখুন

এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য লিখা

Back to top button