অন্যান্য

প্রশ্ন: আমি আমার ছেলের নাম রাখতে চাই। এ সংক্রান্ত ইসলামী আদবগুলো কি কি?

উত্তর: আলহামদুলিল্লাহ।
নিঃসন্দেহে নামের বিষয়টি মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর অন্যতম।
কারণ কারো নাম হচ্ছে তার পরিচায়ক ও তাকে নির্দেশক। তার সাথে যোগাযোগ করা ও তার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করার জন্য নাম জরুরী।
নাম ব্যক্তির শোভা ও প্রতীক; যা দিয়ে দুনিয়া ও আখেরাতে তাকে ডাকা হবে। নাম ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচয় তুলে ধরে ও নির্দেশ করে যে,
সে অমুক ধর্মের অনুসারী। মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিতে নামের নানা রকম বিবেচনা ও নির্দেশনা রয়েছে। মানুষের কাছে নাম পোশাকের মত।
খাটো হলেও খারাপ দেখায়, আবার লম্বা হলেও খারাপ দেখায়।

যে কোন নাম রাখার মূলবিধান হচ্ছে– বৈধতা। তবে কিছু কিছু নামের ব্যাপারে শরয়ি নিষেধাজ্ঞা থাকায় সেগুলো পরিহার করা বাঞ্ছনীয়; যেমন:

– আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কারো আব্‌দ বা দাস হিসেবে নামে নাম রাখা; সেটা কোন প্রেরিত নবীর দাস হোক কিংবা কোন নৈকট্যশীল ফেরেশতার দাস হোক।
কোন অবস্থায় আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কারো আব্‌দ বা দাস হিসেবে নাম রাখা জায়েয নয়।
গাইরুল্লাহ্‌র আব্‌দ বা দাস হিসেবে যেসব নাম রয়েছে; যেমন- عبد النبي (আব্দুন নবী বা নবীর দাস), عبد الأمير (আব্দুল আমির বা আমীরের দাস), ইত্যাদি
যে নামগুলোতে গাইরুল্লাহ্‌-র দাস হওয়া বা অনুগত হওয়ার অর্থ রয়েছে।
কেউ নিজে এভাবে নাম গ্রহণ করলে কিংবা তার পরিবার এভাবে তার নাম রাখলে সে নাম পরিবর্তন করা ওয়াজিব।

মর্যাদাবান সাহাবী আব্দুর রহমান বিন আওফ বলেন: আমার নাম ছিল “عبد عمرو” (আব্দ আমর বা আমরের দাস) –
অন্য রেওয়ায়েতে এসেছে عبد الكعبة (আব্দুল কাবা বা কাবার দাস)। আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করলাম তখন
রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার নাম রাখলেন: ‘আব্দুর রহমান’।
[মুসতাদরাকে হাকিম (৩/৩০৬) এবং যাহাবী তাঁর সাথে সহমত পোষণ করেছেন]

– আল্লাহ্‌র কোন খাস নামে নাম রাখা। যেমন কারো নাম রাখা: আল-খালেক, আর্‌-রাযেক, আর্‌- রব্ব বা আর্‌-রহমান ইত্যাদি যেগুলো আল্লাহ্‌র খাস নাম।
কিংবা এমন নাম রাখা যে বৈশিষ্ট্য আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কারো হতে পারে না;
যেমন- ملك الملوك (মালিককুল মুলুক বা রাজাধিরাজ) কিংবা القاهر (আল-কাহের বা পরাভূতকারী) ইত্যাদি।
এ ধরণের নাম রাখা হারাম এবং কারো এ ধরণের নাম থাকলে পরিবর্তন করে নেয়া ওয়াজিব।
যেহেতু আল্লাহ্‌ বলেছেন: “আপনি কি তাঁর সমনাম কাউকে জানেন?”[সূরা মারিয়াম, আয়াত: ৬৫]

– যেসব নাম বিধর্মী বা কাফের সম্প্রদায়ের খাস নাম সেসব নাম রাখা। অর্থাৎ যে নামগুলো দিয়ে শুধু তাদেরকেই বুঝায় অন্যদেরকে নয়।
যেমন- عبد المسيح (আব্দুল মসিহ বা মসিহ-র দাস), بطرس (বুতরাস বা পিটার), جرجس (জুরজাস বা জর্জ) ইত্যদি কুফরি ধর্ম নির্দেশক নামসমূহ।

– আল্লাহ্‌ ব্যতীত যেসব প্রতিমা বা তাগুতের পূজা করা হয় তাদের নামে নাম রাখা। যেমন- শয়তানের নামে নাম রাখা ইত্যাদি।
উল্লেখিত কোন নাম রাখা জায়েয নয়; বরং হারাম। যে ব্যক্তি পূর্বোক্ত নামগুলোর কোন একটিকে নিজের নাম হিসেবে গ্রহণ করেছেন
কিংবা অন্য কেউ তার নাম রেখেছেন তার কর্তব্য হচ্ছে সে নাম পরিবর্তন করা।

– যে সব নাম সহজাত প্রবৃত্তির কাছে অপছন্দনীয় সেসব নাম রাখা মাকরুহ। এসব নামের খারাপ অর্থের কারণে কিংবা হাসি-ঠাট্টার উদ্রেক করার কারণে।
তাছাড়া এতে করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক ভাল নাম রাখার যে নির্দেশ সেটাও লঙ্ঘিত হয়।
যেমন কারো নাম রাখা ‘হারব’ (যুদ্ধ), ‘রাশ্‌শাশ’ (মেশিন গান), কিংবা ‘হায়াম’ (উটের বিশেষ রোগ), ইত্যাদি যে নামগুলোর অর্থ অসুন্দর ও ঘৃণিত।

– জৈবিক চাহিদা ও উত্তেজনার অর্থ বহন করে এমন নাম রাখা মাকরুহ। মহিলাদের নাম রাখার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বেশি ঘটে থাকে।
যেমন- কিছু কিছু মহিলার নামের মধ্যে যৌন বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ পাওয়া যায়।

– জেনেশুনে গায়ক-গায়িকা, নায়ক-নায়িকা বা এ ধরণের পাপে নিমজ্জিত লোকদের নামে নাম রাখা মাকরুহ।
যদি তাদের নামগুলো সুন্দর অর্থবহ হয় তাহলে সেই সুন্দর অর্থের কারণে তাদের নামে নাম রাখা জায়েয হতে পারে;
তাদের সাথে সাদৃশ্য গ্রহণ কিংবা তাদের অনুকরণ হিসেবে নয়।

– যে সকল নামের মধ্যে পাপ ও সীমালঙ্ঘনের অর্থ রয়েছে সেসব নামে নাম রাখা মাকরুহ। যেমন- সারেক্ব (চোর), জালেম (অন্যায়কারী)।
কিংবা মিশরের ফেরাও ও অন্যান্য পাপিষ্ঠদের নামে নাম রাখা; যেমন- ফেরাউন, হামান, ক্বারুন।

– যে সকল প্রাণী নিকৃষ্ট স্বভাবের জন্য প্রসিদ্ধ সেসব প্রাণীর নামে নাম রাখা মাকরুহ। যেমন- গাধা, কুকুর, বানর ইত্যাদি।

– ইসলাম বা দ্বীন শব্দের সাথে সম্বন্ধযুক্ত করে নাম রাখা মাকরুহ। যেমন- নুর উদ্দীন, শামছুদ্দীন কিংবা নুরুল ইসলাম, শামছুল ইসলাম।
কারণ এর মাধ্যমে ব্যক্তিকে তার প্রাপ্যের চেয়ে বেশি অধিকার দেয়া হয়। সলফে সালেহীন আলেমগণ নিজেরা এ ধরণের উপাধিতে ভূষিত হতে অপছন্দ করতেন।
ইমাম নববী (রহঃ) কে محي الدين (মুহি উদ্দীন বা ইসলাম ধর্মের পুনর্জীবিতকারী) উপাধিতে ডাকা হলে তিনি তা অপছন্দ করতেন।
অনুরূপভাবে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া তার ক্ষেত্রে تقي الدين (তকী উদ্দীন বা ইসলাম ধর্মের ধার্মিক) উপাধিতে ডাকাকে অপছন্দ করতেন।
তিনি বলতেন: কিন্তু, আমার পরিবার আমাকে এ উপাধি দেয়ায় সেটা মশহুর হয়ে গেছে।

– আব্দ শব্দ ব্যতীত অন্য শব্দকে “আল্লাহ্‌” শব্দের সাথে সম্বন্ধযুক্ত করে নাম রাখা মাকরুহ।
যেমন- হাসাবুল্লাহ্‌/হাসাব উল্লাহ্‌, রহমতুল্লাহ্‌/রহমত উল্লাহ্‌ ইত্যাদি। অনুরূপভাবে রাসূল শব্দের সাথে সম্বন্ধযুক্ত করে নাম রাখাও মাকরুহ।

– ফেরেশতাদের নামে নাম রাখা মাকরুহ। অনুরূপভাবে কুরআনের সূরাসমূহের নামে নাম রাখাও মাকরুহ।
যেমন- ত্বহা, ইয়াসীন ইত্যাদি। এ নামগুলো ‘হুরুফে মুকাত্ত্বাআ’ (বিচ্ছিন্ন বর্ণমালা); রাসূলের নাম নয়।
[দেখুন: ইবনুল কাইয়্যেম এর ‘তুহফাতুল মাওদূদ’ পৃষ্ঠা-১০৯]

শুরু থেকে এ নামগুলো দিয়ে নাম রাখা মাকরুহ। কিন্তু, যার পরিবার তার জন্য এ ধরণের কোন নাম রেখেছে, এখন সে বড় হয়েছে এবং
এ নাম পরিবর্তন করা তার পক্ষে কঠিন তার জন্য নাম পরিবর্তন করা আবশ্যকীয় নয়।

নামসমূহের চারটি স্তর:

প্রথম স্তর: ‘আব্দুল্লাহ্‌’ ও ‘আব্দুর রহমান’ এ দুটি নাম। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সহিহ সনদে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি বলেন:
“আল্লাহ্‌র কাছে সর্বাধিক প্রিয় নাম হচ্ছে- আব্দুল্লাহ্‌ ও আব্দুর রহমান।[সহিহ মুসলিম (১৩৯৮)]

দ্বিতীয় স্তর: আল্লাহ্‌র আব্দ বা দাসত্ব অর্থজ্ঞাপক সকল নাম। যেমন- আব্দুল আযিয (আল-আযিযের দাস), আব্দুর রহীম (আর-রহীমের দাস),
আব্দুল মালিক (আল-মালিকের দাস), আব্দুল ইলাহ (আল-ইলাহ-এর দাস), আব্দুস সালাম (আস-সালামের দাস) ইত্যাদি যে নামগুলোতে আল্লাহ্‌র দাসত্বের অর্থ রয়েছে।

তৃতীয় স্তর: নবীগণ ও রাসূলগণের নামসমূহ। নিঃসন্দেহে তাঁদের মধ্যে সর্বোত্তম ও সবচেয়ে মর্যাদাবান হচ্ছেন আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
তাঁর নামসমূহের মধ্যে রয়েছে- আহমাদ। এর পরের স্তরে রয়েছেন- ‘উলুল আযম’ শ্রেণীর রাসূলগণ।
তাঁরা হচ্ছেন- ইব্রাহিম (আঃ), মূসা (আঃ), ঈসা (আঃ) ও নূহ (আঃ)। তাঁদের পরে অন্য সকল নবী ও রাসূল।

চতুর্থ স্তর: আল্লাহ্‌র নেককার বান্দাগণের নাম। তাঁদের মধ্যে সর্বপ্রথম আসবে সাহাবীদের নাম।
তাঁদের অনুকরণ ও উচ্চ মর্যাদা লাভের আশায় তাঁদের সুন্দর নামগুলো দিয়ে নাম রাখা মুস্তাহাব।

পঞ্চম স্তর: প্রত্যেক সুন্দর ও সঠিক অর্থবোধক ভাল নাম।
নাম রাখার সময় কিছু বিষয় খেয়াল রাখা ভাল; যেমন-

১। এ বিষয়টি অনুধাবন করা যে, সন্তান এ নামটি আজীবন ধারণ করবে। এ নামের কারণে হয়তো তাকে বিব্রতকর পরিস্থিতি ও সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে।
যার ফলে তার পিতার প্রতি বা মাতার প্রতি কিংবা যে ব্যক্তি তার নামটি রেখেছে সে ব্যক্তির প্রতি তার খারাপ মনোভাব হবে।

২। অনেকগুলো নামের মধ্য থেকে সন্তানের জন্য একটি নাম নির্বাচন করার সময় কয়েকটি দিক বিবেচনা করা উচিত।
স্বয়ং নামটি উপযুক্ত কিনা? এ নামটি একজন শিশুর নাম, একজন প্রাপ্তবয়স্ক যুবকের নাম, একজন বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি ও পিতার নাম হিসেবে কেমন হবে?
এ নাম দিয়ে উপনাম তৈরী করলে (অমুকের পিতা) কেমন হবে? পিতার নামের সাথে মিলিয়ে লিখলে (অমুক বিন অমুক) কেমন হবে? ইত্যাদি।

৩। সন্তানের নাম রাখা পিতার শরয়ি অধিকার। যেহেতু পিতার দিকে সন্তানকে সম্বন্ধিত করা হবে।
কিন্তু পিতার জন্য মুস্তাহাব হচ্ছে নাম নির্বাচনে মাকেও অংশীদার করা এবং মায়ের মতামত নেয়া যাতে করে নামটি সুন্দর হলে মা এতে সন্তুষ্ট থাকেন।

৪। সন্তানকে তার পিতার দিকেই সম্বন্ধিত করা ওয়াজিব; পিতার মৃত্যু হলেও কিংবা তালাকদাতা হলেও।
এমনকি পিতা যদি সন্তানের প্রতিপালনের দায়িত্ব না নেয় কিংবা আদৌ তাকে না দেখে তবুও।
সন্তানকে তার পিতা ছাড়া অন্য কারো সন্তান হিসেবে পরিচয় দেয়া হারাম; শুধুমাত্র এক অবস্থা ছাড়া।
সেটা হচ্ছে- যদি ব্যভিচারের কারণে কোন সন্তানের জন্ম হয়; আমরা আল্লাহ্‌র কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
সেক্ষেত্রে সন্তানকে তার মায়ের দিকে সম্বন্ধিত করা হবে। তাকে তার পিতার দিকে সম্বন্ধিত করা জায়েয হবে না।

 

মুফতী: শাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ

 

 

➥ লিংকটি কপি অথবা প্রিন্ট করে শেয়ার করুন:
পুরোটা দেখুন

এই বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য লিখা

Back to top button